প্রধানমন্ত্রীর সফর : প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন

মোহাম্মদ আলী


মে ০২, ২০২৬
০৩:০৭ পূর্বাহ্ন


আপডেট : মে ০২, ২০২৬
০৩:০৭ পূর্বাহ্ন



প্রধানমন্ত্রীর সফর : প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন


দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম সিলেট সফর কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন। এই সফর ঘিরে সিলেটবাসীর মনে যে আশা-আকাক্সক্ষার সঞ্চার হয়েছে, তা দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসানের একটি সম্ভাব্য সূচনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সিলেটের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং অর্থনৈতিক অবদান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রবাসী আয়ের বড় একটি অংশ আসে এই অঞ্চল থেকে, যা জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। তবুও অবকাঠামো উন্নয়ন, নগর ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা শিক্ষা খাতে সিলেট বহু ক্ষেত্রেই কাক্সিক্ষত অগ্রগতি থেকে পিছিয়ে রয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এই অঞ্চলের সমস্যাগুলো এবার কেন্দ্রীয়ভাবে গুরুত্ব পাবে বলে সিলেটবাসী আশা করছে।

মানুষের প্রত্যাশা মূলত উন্নয়নকেন্দ্রিক। চাঁদনীঘাট এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। সিলেট শহরে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের সমস্যা। এটি শুধু জনদুর্ভোগই সৃষ্টি করে না, বরং ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাস্থ্য এবং নগরজীবনের স্বাভাবিক গতিকেও ব্যাহত করে। 

কিন্তু অতীতে এমন অনেক প্রকল্প শুরু হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধীরগতি, দুর্নীতি বা পরিকল্পনার দুর্বলতার কারণে কাক্সিক্ষত ফল আসেনি। ফলে এবার মানুষের প্রত্যাশা ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নই হোক মূল বিষয়।

নদী পুনঃখনন কর্মসূচি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। নদী ও খাল সিলেট অঞ্চলের প্রাণ। কিন্তু দখল, ভরাট এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এই জলাধারগুলো ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে। এর ফলেই জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা বাড়ছে। নদী পুনঃখনন যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি শুধু পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নই করবে না, বরং পরিবেশ রক্ষায়ও বড় ভূমিকা রাখবে। তবে এখানে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান।

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬ আয়োজন একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ক্রীড়া শুধু শারীরিক সুস্থতার জন্য নয়, এটি শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব এবং ইতিবাচক মানসিকতার বিকাশ ঘটায়। সিলেট অঞ্চলে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় রয়েছে, কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তারা হারিয়ে যায়। এই আয়োজন যদি নিয়মিত ও কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে এটি একটি নতুন প্রজন্মের বিকাশে সহায়ক হতে পারে।

সিলেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো যোগাযোগব্যবস্থা। বিশেষ করে রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগ সকল স্থলে ভীষণ কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া শহরের ভেতরের যানজট, সড়কের বেহাল অবস্থা এবং গণপরিবহনের অনিয়ম মানুষকে প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে ফেলে। একইভাবে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে। 

সরকারি হাসপাতালগুলোতে জনবল সংকট, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা রোগীদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। এই খাতগুলোতেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি দীর্ঘদিনের।

শিক্ষা খাতেও বৈষম্য স্পষ্ট। ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে বিদেশ চলে যায়, যা এক ধরনের ‘ব্রেইন ড্রেইন’ তৈরি করে। এই বাস্তবতা পরিবর্তনে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফর রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি তার সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথম সিলেট সফর। তাই এটি একটি বার্তা বহন করে এই অঞ্চল সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে। সিলেটবাসী দেখতে চায়, এই সফর কেবল রাজনৈতিক উপস্থিতি নয়, বরং একটি দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রতিফলন।

মানুষের প্রত্যাশা শুধু প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ নেই। মানুষ বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা চায় এমন একটি সিলেট, যেখানে জলাবদ্ধতা থাকবে না, নদীগুলো প্রাণ ফিরে পাবে, তরুণরা সুযোগ পাবে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত শক্তিশালী হবে।

আমরা চাই উন্নয়ন হোক টেকসই, পরিকল্পিত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক। 



মোহাম্মদ আলী : প্রাবন্ধিক