স্বামীর মৃত্যুর খবর জানেন না হাসপাতালে থাকা স্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক


মে ০৩, ২০২৬
০৫:৫৯ অপরাহ্ন


আপডেট : মে ০৩, ২০২৬
০৫:৫৯ অপরাহ্ন



স্বামীর মৃত্যুর খবর জানেন না হাসপাতালে থাকা স্ত্রী

সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি বিভাগের একটি শয্যায় বসে ছিলেন হাফিজা বেগম। মাথায় আঘাতের চিহ্ন, চোখেমুখে ক্লান্তি। পাশে চার শিশু সন্তান। কেউ মায়ের গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে, কেউ চুপচাপ চারপাশ দেখছে। কিন্তু তাদের কেউই এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি, কয়েক ঘণ্টা আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়েছে তাদের বাবাকে।

রোববার সকাল ছয়টার দিকে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার তেলিবাজার এলাকায় ট্রাক ও পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে আটজন নিহত হন। আহত হন আরও কয়েকজন। নিহতদের একজন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পুটামারা গ্রামের বদরুজ্জামান (৪৫)। দুর্ঘটনায় আহত হয়ে একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তাঁর স্ত্রী হাফিজা বেগম (২৮)। তবে দুপুর পর্যন্ত তিনি জানতেন না, তাঁর স্বামী আর বেঁচে নেই।

স্বজনরা জানান, ভোরে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে কাজে বেরিয়েছিলেন। ঘরে রেখে যান চার শিশুসন্তানকে। নগরের শামীমাবাদ এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন তারা। প্রায় দুই বছর আগে গ্রাম ছেড়ে সিলেটে এসে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন দুজনেই।

হাসপাতালে শুয়ে হাফিজা বেগম বলেন, “আমরা পিকআপে করে কাজে যাচ্ছিলাম। পরে একটা ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। মাথায় আঘাত পাই। এরপর আর কিছু মনে নাই।”

জ্ঞান ফেরার পর তিনি শুধু জানতে পারেন, হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তাঁর ধারণা, স্বামীও একই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। স্বজনরা তখনও তাঁকে স্বামীর মৃত্যুর খবর জানাননি।

বেলা পৌনে দুইটার দিকে শারীরিক পরীক্ষার জন্য হাফিজাকে ক্যাজুয়ালটি বিভাগ থেকে অন্যত্র নেওয়া হয়। ওই সময় হাসপাতালের শয্যায় বসেছিল তাঁদের চার সন্তান। আর হাসপাতালের মর্গে অন্য সাতজনের মরদেহের সঙ্গে পড়ে ছিল বদরুজ্জামানের নিথর দেহ।

মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বদরুজ্জামানের চাচাতো ভাই সালেহ আহমদ। কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে তাঁর। “চারটা ছোট বাচ্চা রেখে গেল। সকালে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে কাজে বের হয়েছিল। একজন মারা গেছে, আরেকজন হাসপাতালে। এখন এই বাচ্চাগুলোর কী হবে, সেটাই ভাবছি,” বলেন তিনি।

আহত কয়েকজন জানান, একটি ভবনে ঢালাইয়ের কাজের জন্য আম্বরখানা থেকে শ্রমিকদের নিয়ে একটি পিকআপ দক্ষিণ সুরমার লালাবাজারের দিকে যাচ্ছিল। পিকআপে প্রায় ২০ জন শ্রমিক ছিলেন। সঙ্গে ছিল ঢালাই মেশিন। তেলিবাজার এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা কাঁঠালবোঝাই একটি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে পিকআপে থাকা শ্রমিকরা ছিটকে পড়েন।

নিহতদের মধ্যে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিখলা গ্রামের দুই ভাই আজির উদ্দিন (৩৫) ও আমির উদ্দিন (২২) রয়েছেন। প্রায় এক দশক ধরে সিলেট নগরের সুবিদবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতেন তারা।

বেলা একটার দিকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে এসে দুই ভাইয়ের মরদেহ শনাক্ত করেন তাঁদের খালাতো ভাই শামীম আহমদ। তিনি বলেন, “ফেসবুকে দুর্ঘটনার খবর আর ছবি দেখে সন্দেহ হয়েছিল। পরে হাসপাতালে এসে লাশ দেখে নিশ্চিত হই।”

একসঙ্গে দুই ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর গ্রামের বাড়িতে শোকের মাতম নেমেছে বলে জানান তিনি।

আরসি-০২