ফাঁসির দণ্ডের ১৩ বছর পর ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধী আযাদের আত্মসমর্পণ

সিলেট মিরর ডেস্ক


জানুয়ারি ২১, ২০২৬
১২:১৭ অপরাহ্ন


আপডেট : জানুয়ারি ২১, ২০২৬
১২:১৮ অপরাহ্ন



ফাঁসির দণ্ডের ১৩ বছর পর ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধী আযাদের আত্মসমর্পণ

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার অবশেষে আত্মসমর্পণ করেছেন। রায় ঘোষণার প্রায় বারো বছর পর বুধবার সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে তিনি আত্মসমর্পণ করেন।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে আত্মসমর্পণ করেন একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত মাওলানা আবুল কালাম আযাদ। আত্মসমর্পণের পর তাকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২–এর তৎকালীন চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন। এটি ছিল যুদ্ধাপরাধের মামলায় ঘোষিত প্রথম রায়। তবে রায় ঘোষণার সময় তিনি পলাতক ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আগেই তিনি পালিয়ে যান এবং ভারত হয়ে পাকিস্তানে চলে যান।

এই মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয় ২০১২ সালের ২৬ ডিসেম্বর। পরে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়। অভিযুক্ত অনুপস্থিত থাকায় তার অনুপস্থিতিতেই বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করে ট্রাইব্যুনাল।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের ৮ জুলাই সাজা স্থগিত চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন আবুল কালাম আযাদ। এরপর একই বছরের ২২ অক্টোবর সরকার তার সাজা এক বছরের জন্য স্থগিত করে। তবে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার আগে তাকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় বুধবার ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে আত্মসমর্পণ করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়, জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রুকন আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগের মধ্যে সাতটিতে মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা, গণহত্যা ও ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

রায়ের তৃতীয়, চতুর্থ ও ষষ্ঠ অভিযোগে আযাদের বিরুদ্ধে হত্যার দায় প্রমাণিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৪ মে বোয়ালমারীর কলারন গ্রামে সুধাংশু মোহন রায়কে গুলি করে হত্যা, ১৬ মে সালথার পুরুরা গ্রামে মাধব চন্দ্র বিশ্বাসকে গুলি করে হত্যা এবং ৩ জুন ফুলবাড়িয়া গ্রামে চিত্তরঞ্জন দাসকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় তার সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পায় ট্রাইব্যুনাল।

সপ্তম অভিযোগে গণহত্যার দায় প্রমাণিত হয়। এতে বলা হয়, ১৭ মে বোয়ালমারীর হাসামদিয়া গ্রামের হিন্দুপাড়ায় রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে হামলা চালিয়ে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও নির্বিচারে গুলি চালিয়ে সাতজনকে হত্যা করা হয়। অপহরণের পর আরও দুইজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

প্রথম, পঞ্চম ও অষ্টম অভিযোগে অপহরণ, আটকে রাখা, নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হলেও সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ায় এসব অভিযোগে পৃথক কোনো সাজা দেওয়া হয়নি। তবে দ্বিতীয় অভিযোগে এক ব্যক্তিকে আটক ও নির্যাতনের বিষয়টি প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে না পারায় ওই অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়।

১৯৪৭ সালের ৫ মার্চ ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার বড় খাড়দিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া আবুল কালাম আযাদ এলাকায় পরিচিত ছিলেন ‘খাড়দিয়ার বাচ্চু’ নামে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগী হিসেবে রাজাকার বাহিনী গড়ে তুলে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করেন তিনি। যুদ্ধের পর পালিয়ে গেলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে ‘মাওলানা আবুল কালাম আযাদ’ নামে নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করেন।

পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে নিজেকে ‘ইসলামী চিন্তাবিদ’ হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং দীর্ঘদিন পলাতক অবস্থায় ছিলেন। যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হলে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। অনুপস্থিতিতেই বিচার শেষে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

এক যুগ পর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত এই যুদ্ধাপরাধ মামলার নতুন অধ্যায় শুরু হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরসি-০৬