বেলাল আহমেদ
ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২২
০৮:৪২ পূর্বাহ্ন
আপডেট : ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২২
০৮:৪২ পূর্বাহ্ন
বসন্ত কিংবা ঋতুরাজ বসন্ত। কুয়াশার আঁচল সরিয়ে আজ দুয়ারে এল বসন্ত। যেন নতুন হয়ে উঠেছে পুরোনো পৃথিবী। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে, মধুর মলয়সমীরে মধুর মিলন রটাতে।’
আকাশ ভর্তি আগুন রঙা সোনালি রোদ। খোলে যাবে দুয়ার। বইবে ফাগুনের হাওয়া। সেই হাওয়ারই স্পর্শে শীতের খোলস থেকে জেগে উঠেছে কৃষ্ণচ‚ড়া, রাধাচ‚ড়া, নাগলিঙ্গম। মৃদু-মন্দ বাতাসে ভেসে আসা ফুলের গন্ধে বসন্ত জানিয়ে দিচ্ছে, সত্যিই সে ঋতুরাজ বসন্ত। শিমুল-পলাশ-অশোকের শাখা ভরে উঠেছে রক্তিম ফুলের সম্ভারে। মাঝে বয়ে যাওয়া দমকা হাওয়ায় দুলে উঠছে সেই কুসুমশোভিত শাখা। ঝরে যাচ্ছে পুরোনো জীর্ণ মলিন পাতা।
‘আহা আজি এ বসন্তে, এত ফুল ফোটে, এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়....।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গান বসন্ত এলেই বাঙালির দেহ-মনে জাগায় নতুন শিহরণ। কোকিলের কুহু ডাক, প্রকৃতিতে জেগে ওঠা বিপুল প্রাণের স্পন্দন কুসুমশোভিত বহতা বাতাস নাগরিক হৃদয়ে গভীর আবেগ জাগিয়ে তুলে।
শীতের হতশ্রী প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেয় লাবণ্য সুষমা। আর তাই বসন্ত ঋতুরাজ, বসন্ত প্রেমের ঋতু। নতুন কিছুর প্রত্যয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা নিয়ে এসেছে বসন্ত। লাল-হলুদের বাসন্তী রঙে প্রকৃতির সঙ্গে নিজেদের সাজিয়ে আজ বসন্তের উচ্ছলতা ও উন্মাদনায় ভাসবে প্রতিটি বাঙালি।
গাছে গাছে নতুন পাতা, স্নিগ্ধ সবুজ কচি পাতার ধীরগতিতে বাতাসের সঙ্গে বয়ে চলা জানান দেয় নতুন কিছুর। পলাশ, শিমুলগাছে লাগে আগুন রঙের খেলা। প্রকৃতিতে চলে মধুর বসন্তের সাজসাজ রব। আর এ সাজে মন রাঙিয়ে গুনগুন করে অনেকেই আজ গেয়ে উঠবেন- ‘মনেতে ফাগুন এল...।’
কোকিলের কুহুতান, দখিনা হাওয়া, ঝরাপাতার শুকনো নূপুরের নিক্বন, প্রকৃতির মিলন এ বসন্তেই। বসন্ত মানেই পূর্ণতা। বসন্ত মানেই নতুন প্রাণের কলরব। মিলনের এ ঋতু বাসন্তী রঙে সাজায় মনকে, মানুষকে করে আনমনা।
নাগরিক জীবনে বসন্তের আগমন বার্তা নিয়ে আসে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি। বসন্ত আমাদের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহীদদের রক্ত রঙিন পুষ্পিত রক্তের স্মৃতির ওপর রঙ ছড়ায়। ১৯৫২ সালের ৮ই ফাল্গুন বা একুশের পলাশরাঙা দিনের সঙ্গে তারুণ্যের সাহসী উচ্ছাস আর বাঁধভাঙা আবেগের জোয়ার যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
বসন্তের প্রথম দিনে অসংখ্য রমণী বাসন্তী রঙে নিজেকে রাঙিয়ে তুলবেন। এ বসন্তের দোলা ছড়িয়ে পড়ে দেশের সর্বত্র এবং সারা পৃথিবীর সব বাঙালির ঘরে ঘরে। তবে বাস্তবতার পাথরচাপা হৃদয়ে সবুজ বিবর্ণ হওয়া চোখে প্রকৃতি দেখার সুযোগ পান না নগরবাসী।
কোকিলের ডাক, রঙিন কৃষ্ণচূড়া আর আমের মুকুলের কথা বইয়ের পাতায় পড়ে থাকলেও একালের তরুণ-তরুণীরা কিন্তু বসে থাকতে রাজি নন। গায়ে হলুদ আর বাসন্তী রঙের শাড়ি জড়িয়ে তরুণী ও পাঞ্জাবি পরা তরুণরাও এদিন নিজেদের রঙিন সাজে সাজাতে কম যান না। বসন্ত তারুণ্যেরই ঋতু, তাই সবারই মনে বেজে ওঠে সেই গানÑ ‘বসন্ত ছুঁয়েছে আমাকে। ঘুমন্ত মন তাই জেগেছে, পয়লা ফাল্গুন আনন্দের দিনে।’
বাংলা পঞ্জিকা বর্ষের শেষ ঋতু বসন্তের প্রথম দিনকে বাঙালি পালন করে ‘পহেলা ফাল্গুন-বসন্ত উৎসব’ হিসেবে। বাঙালির নিজস্ব সার্বজনীন প্রাণের উৎসবের মাঝে এ উৎসব এখন গোটা বাঙালির কাছে ব্যাপক সমদৃত হয়েছে। এই উৎসব এখন প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে।
মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৫ স্টাব্দে প্রথম বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেন। নতুন বছরকে কেন্দ্র করে ১৪টি উৎসবের প্রবর্তন করেন তিনি। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বসন্ত উৎসব। ১৪০১ বঙ্গাব্দ থেকে ‘বসন্ত উৎসব’ উদযাপন শুরু হয়।
আরসি-০৩