নাবিল হোসেন
ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০২২
০৫:৫৭ পূর্বাহ্ন
আপডেট : ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০২২
০৩:৩৬ পূর্বাহ্ন
সিলেটেকরোনারভাইরাসের টিকাদান শুরুর এক বছর পূর্ণ হবে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু এক বছরের টিকাদানের আওতায় এসেছে মাত্র ৫০ ভাগ মানুষ। প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হওয়ায় বিভাগের চার জেলায়ই মর্ডানা, ফাইজার কিংবা অ্যাসট্রেজেনেকা টিকা নিতে আগ্রহী সবাই। কিন্তু সিলেট এখন দেওয়া হচ্ছে সিনোভ্যাক বা সিনোফার্মের টিকা।
সিলেটে বতমানে প্রথম ডোজের জন্য সিনোফার্ম বা সিনোভ্যাকের টিকা দেওয়া হচ্ছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যেতে হলে অ্যাস্ট্রাজেনেকা, মডার্না, ফাইজার, জনসনের টিকা নিতে হয়। আবার সিনোফার্ম বা সিনোভ্যাকের টিকা নিলে বুস্টার ডোজ গ্রহণ করতে হবে। এ অবস্থায় প্রবাসী অধুষ্যিত সিলেটে বিশেষ বিবেচনায় ফাইজার, মডার্না, জনসন বা অ্যাস্ট্রজেনেকার বেশি পরিমাণ টিকা বরাদ্দের দাবি জনপ্রতিধিসহ স্থানীয়দের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত রবিবার পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ৫৮ লাখ ৮৩ হাজার ৯৩৫ জন প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছেন। বিভাগে মোট জনসংখ্যা হলো ১ কোটি ১৭ লাখ ৯ হাজার ৪৬৪ জন। অর্থাৎ এক ডোজ টিকার আওতায় এসেছেন মোট জনসংখ্যার ৫০ দশমিক ২৪ শতাংশ। এছাড়া দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন ৩৪ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৯ জন। দুই ডোজ টিকার আওতায় এসেছেন বিভাগের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ।
সিলেটে প্রথম দিকে ভয় এবং নানা অপপ্রচারের কারণেকরোনা টিকা গ্রহীতার সংখ্যা ছিল কম। পরে বাড়তে থাকে টিকা গ্রহণকারী সংখ্যা। টিকাকেন্দ্রগুলোতেও ছিল উপচে পড়া ভিড়। গণটিকায়ও মানুষের সাড়া ছিল আশাব্যাঞ্জক। তবে বতমানে টিকা গ্রহণে মানুষের আগ্রহে ভাটা পড়েছে।
জানা গেছে, আগ্রহ কমার অন্যতম প্রধান কারণ হলো সিলেটে বর্তমানে প্রথম ডোজ সিনোফার্ম ও সিনোভ্যাকের টিকা দেওয়া হচ্ছে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে যেতে প্রয়োজন হয় ফাইজার, মডার্না, জনসন বা অ্যাস্ট্রজেনেকার টিকা। আবার সিনোফার্ম ও সিনোভ্যাকের দুই ডোজ টিকা নেওয়া থাকলেও প্রয়োজন হয় বুস্টার ডোজের। বুস্টার ডোজ টিকা নিতে হয় দুই ডোজ টিকাদানের ৬ মাস পর।
বর্তমানে দেশে বুস্টার ডোজ গ্রহণের বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ বছর। অর্থাৎ ৪০ বছরের কম কেউ বুস্টার ডোজের টিকা গ্রহণ করতে পারবেন না। তবে জরুরি সেবা বা সম্মুখসারির যোদ্ধাদের ক্ষেত্রে বয়সসীমা প্রযোজ্য নয়। এদিকে সিলেটের ওসমানী হাসপাতাল কেন্দ্রে ফাইজার, মডার্নার টিকার জন্য স্বাস্থ্যকর্মী ও টিকা নিতে আসা মানুষের মধ্যে প্রায়ই তর্ক যুদ্ধ লেগেই থাকে। অনেক সময় তা হাতহাতিতে রূপ নেয়।
সিলেট সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহে সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকার ৩১ হাজারের বেশি মানুষকে সিনোভ্যাে কর প্রথম ডোজ টিকা গ্রহণের জন্য মুঠোফোনে বার্তা (ম্যাসেজ) পাঠিয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ । তবে এ সময় টিকা নিয়েছেন ১৬ হাজার ৯২২ জন। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক মানুষ টিকা গ্রহণের জন্য আসেননি।
এ অবস্থায় মঙ্গলবার দেশের বর্তমান করোনা পরিস্থিতির বিষয়ে আয়োজিত এক সভায় সিলেট সিটি করপোরেশসনসহ সিলেট বিভাগে বেশি পরিমাণে মডার্নার ও ফাইজারের টিকা দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেককে অনুরোধ জানিয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী।
এ বিষয়ে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট মিররকে বলেন, ‘সিলেট প্রবাসী অধুষ্যিত অঞ্চল। তাই এখানে যাতে বেশি পরিমাণে মডার্না ও ফাইজারের টিকা দেওয়া হয় সেজন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়েছি।’
এদিকে সিলেটের বিভিন্ন ট্রাভেলস এজেন্সি সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন দেশে বিধি-নিষেধ প্রত্যাহারের পর সিলেট থেকে প্রচুর মানুষ প্রবাসে যাচ্ছেন। এদের প্রায় বেশিরভাগের গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে।
এ বিষয়ে লতিফ ট্রাভেলসের পরিচালক ও হজ্জ এজেন্সীস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) এর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের সহসভাপতি জহিরুল কবির চৌধুরী শিরু সিলেট মিররকে বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশ করোনা বিধি-নিষেধ তুলে নেওয়ার পর সিলেট থেকে প্রচুর মানুষ প্রবাসে পাড়ি জমাচ্ছেন । এদের বড় অংশই যাচ্ছেন দুবাই, ওমান, সৌদি ও কাতারে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যেতে হলে অ্যাস্ট্রাজেনেকা, মডার্না, ফাইজারের দুই ডোজ টিকা গ্রহণ করতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিনোফার্ম বা সিনোভ্যাকের টিকা নিলে বুস্টার ডোজের টিকা গ্রহণ করতে হয়। এছাড়া কেউ মধ্যপ্রাচ্যে যেতে পারবেন না। এ অবস্থায় সিলেটে যদি সরকার বেশি পরিমাণে ফাইজার বা মডার্নার টিকা পাঠায় তাহলে সিলেটবাসী উপকৃত হবে।’
টিকা গ্রহণে আগ্রহ কমার বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘অনেকেই সিনোফার্ম বা সিনোভ্যাকের টিকা নিতেইচ্ছুক না। তারা মনে করেন এ সব টিকা নিলে বিদেশ যেতে সমস্যাহবে। তবে মডার্না বা ফাইজারের টিকাদান চলাকালে মানুষের ভিড় থাকে বেশি।’
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ বলেন, ‘বিদেশ যেতে যারা ইচ্ছুক তারা ফাইজার ও মডার্নার টিকা চায়। কিন্তু বর্তমানে জেলায় প্রথম ডোজের জন্য সিনোফার্ম ও সিনোভ্যাকের টিকা দেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় ফাইজার বা মডার্নার বেশি পরিমাণ টিকা পাঠাতে আলাপ-আলোচনা হলেও কোনো সুরাহা হয়নি।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সিলেট জেলায় প্রথম ডোজ নিয়েছেন ২০ লাখ ৯১ হাজার ৯৪৫ জন। জেলায় মোট জনসংখ্যা ৪০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৩ জন। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৫১ দশমিক ৫৭ শতাংশ মানুষ প্রথম ডোজ আওতায় এসেছেন। জেলায় দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন ১২ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৮ জন। দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন মোট জনসংখ্যার ৩০ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
সুনামগঞ্জে মোট জনসংখ্যা ২৯ লাখ ১৬ হাজার ৩২৭ জন। এদেরমধ্যে প্রথম ডোজ নিয়েছেন ১৩ লাখ ৫০ হাজার ২২০ জন আর দুই ডোজ নিয়েছেন ৮ লাখ ৮ হাজার ৩৬৪ জন। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৪৬ দশমিক ২৯ শতাংশ মানুষ প্রথম ডোজ এবং ২৭ দশমিক ৭১ শতাংশ মানুষ দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন।
হবিগঞ্জের ২৪ লাখ ৬৮ হাজার ৮৭৫ জনের মধ্যে প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন ১২ লাখ ৬৫ হাজার ৮৬৬ জন। জেলায় দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন ৭ লাখ ২৬ হাজার ৭৭ জন। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৫১ দশমিক ২৭ শতাংশ মানুষ প্রথম ডোজ এবং ২৯ দশমিক ৪০ শতাংশ মানুষ দুই ডোজ টিকার আওতায় এসেছেন।
আর মৌলভীবাজার জেলার মোট জনসংখ্যার সংখ্যাহলো ২২ লাখ ৬৭ হাজার ৮০৯ জন। এদেরমধ্যে প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন ১১ লাখ ৭৫ হাজার ৯০৪ জন আর দুই ডোজ নিয়েছেন ৭ লাখ ১০ হাজার ৩৬০ জন। অর্থাৎ জেলার মোট জনসংখ্যার মধ্যে ৫১ দশমিক ৮৫ শতাংশ প্রথম ডোজ আর ৩১ দশমিক ৩২ শতাংশের দুই ডোজ নিয়েছেন।
এদিকে বাংলাদেশকে এক কোটি ডোজ ফাইজারের টিকা অনুদান দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গত সোমবার ঢাকায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস এ তথ্য জানিয়েছে।
দূতাবাস জানায়, এই টিকা বাংলাদেশের শিক্ষার্থী এবং যারা এখনও টিকার প্রথম ডোজ পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন, তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া সহজহ। এছাড়া ভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রনের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকতে ফাইজারের বুস্টার ডোজ টিকা নেওয়া যাবে। এর আগে সম্প্রতি আরও ৯৬ লাখ ফাইজারের টিকা পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র।
আরসি-০২