রাজীব চৌধুরী
৩০ ডিসেম্বর , ২০২৫
আজ আমরা শোকের গভীরে প্রবেশ করে স্মরণ করছি এক জীবনকে, যা শুধু রাজনৈতিক নয়—যা ছিল দায়িত্ব, ত্যাগ, সংগ্রাম এবং দেশের প্রতি অবিচল প্রেমের এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য নাম, যার প্রভাব দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে অমোঘভাবে ছুঁয়ে গেছে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, নেতৃত্ব মানে শুধু ক্ষমতায় থাকা নয়, এটি হলো জনকল্যাণে নিয়োজিত থাকা, দায়বোধ ধারণ করা এবং জনগণের পাশে দাঁড়ানো।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় সেই সময়, যখন বাংলাদেশ শোক ও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ছিল। স্বামী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক মৃত্যু দেশকে বিচলিত ও বিভ্রান্ত করেছে। সেই সময়ে তিনি বিএনপি’র নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। একটি নারীর জন্য এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ ছিল না; তবুও, তিনি সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে তিনি দলটিকে জনমত ভিত্তিক, সংগঠিত এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। প্রতিটি মণ্ডলে, প্রতিটি সংকটে, প্রতিটি সময় দেশের কল্যাণের জন্য নিরলসভাবে কাজ করেছেন। ১৯৯১ সালে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত হয়ে তিনি সংসদীয় সরকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। এটি গণতন্ত্রের জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়, যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে নতুন দিগন্তের সূচনা।
শিক্ষা খাতে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। ১৯৯০-এর দশকে মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষা এবং প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা গ্রামীণ অঞ্চলে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেয়। জাতীয় ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুমোদন দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বিস্তৃত করে। এই উদ্যোগ শুধু শিক্ষার প্রবেশাধিকার বাড়ায়নি, দেশের যুবসমাজের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
স্বাস্থ্য খাতেও তাঁর নীতি দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর প্রভাবশালী ছিল। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বেড সংখ্যা বৃদ্ধি, মাতৃত্বকালীন ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ—এসব পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করেছে। মাতৃপূর্বক ও শিশু মৃত্যুহার কমানো, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে, তাঁর সরকারের মানবিক মনোভাবের প্রমাণ।
কৃষিক্ষেত্রেও তাঁর নেতৃত্বের ছাপ স্পষ্ট। আধুনিক সেচ, ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষি ঋণ ও প্রণোদনা—এসব নীতি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় অবদান রেখেছে। কৃষক সমাজের জীবনমান উন্নয়নে এই পদক্ষেপগুলো দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
সামাজিক নীতিমালায় তিনি বিশেষ মনোযোগ দিয়েছিলেন নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা নেট, বন ও পরিবেশ রক্ষা, এবং বিচারব্যবস্থা উন্নয়নের দিকে। মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, সরকারি চাকরি ও শিক্ষায় নারীদের জন্য কোটা বৃদ্ধি—এসব পদক্ষেপ দেশের নারী সমাজকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করেছে। নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আইনি অধিকারের প্রসার তাঁর নীতি ও দায়বোধের অঙ্গ।
সাহিত্য, সংস্কৃতি ও খেলাধুলায় তাঁর আগ্রহ ও পৃষ্ঠপোষকতা সমাজে মানবিক ও সৃজনশীল চেতনা বৃদ্ধি করেছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে খেলার সুযোগ সৃষ্টি, সংস্কৃতির বিকাশ এবং প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের উদ্ভব—এসব উদ্যোগ সমাজের মানসিক ও সামাজিক শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতিতেও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করেছেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক দৃঢ় করা, প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মসংস্থান, বাণিজ্যিক সহযোগিতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা—এসব ক্ষেত্রে দেশের জন্য উল্লেখযোগ্য সুবিধা নিশ্চিত করেছে।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন কখনো সহজ ছিল না। দীর্ঘ কারাবাস, মামলা, অসুস্থতা—সবকিছু সত্ত্বেও তিনি দেশের মাটিতেই থেকে গণতন্ত্র রক্ষায় কাজ চালিয়ে গেছেন। বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দেশ ছাড়েননি। এই দৃঢ়তা, সাহস এবং দায়িত্ববোধ তাঁর নৈতিক ও রাজনৈতিক চরিত্রের এক অমোঘ নিদর্শন।
একবার তিনি নিজেই বলেছেন, "If Bangladesh thrives, so do I; this country is my only home."—এই সংক্ষিপ্ত বাক্যেই তাঁর দেশপ্রেম ও দায়বদ্ধতার গভীরতা প্রতিফলিত।
আজ আমরা শোকাহত, কিন্তু তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—নেতৃত্ব মানে শুধু ক্ষমতায় থাকা নয়। এটি হলো জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত থাকা, দায়িত্বশীলতা, ত্যাগ স্বীকার এবং জনগণের পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু এক যুগের সমাপ্তি ঘোষণা করেছে, তবে তাঁর স্বপ্ন, সংগ্রাম ও নীতি ভবিষ্যতের প্রজন্মের জন্য এক অমলিন শিক্ষা হিসেবে থেকে যাবে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও সামাজিক উন্নয়নের ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।